Friday, January 9, 2015

ক্র্যাক ডুড বা কুল ডুড

ইন্ডিয়ান চ্যানেলগুলাতে সালমান খানের একটা অ্যাড প্রায়ই দেখায়। ইয়া উঁচা একটা পাহাড়ের উপর থেকে লাফ দেওয়ার আগে বেশ ভাব নিয়া মাউন্টেন ডিউ নামে একটা ড্রিংকসে চুমুক দেয়... তারপর লাফ... বিশাল কুলনেসের ব্যাপারস্যাপার। প্রজন্মের আপডেটেড পোলাপানরে প্রায়ই সালমান খান আর তার "আজ কুচ তুফানি কারতে হ্যায়" নিয়া বেশ উত্তেজিত হইতে দেখি। অনেকেই কুল ডুড বলতে চোখ বন্ধ কইরা সাল্লুরে বুঝে, তার মসলাদার অ্যাকশন মুভি দেইখা চোখ বড় বড় কইরা বলে, কি মাইর দেয় দেখছ? পুরাই ক্র্যাক...
ধানমণ্ডি ২৮ এর হাইডআউটে জরুরী মিটিং চলতেছে। আলম, বদি, স্বপন,চুল্লু ভাই,জুয়েল, জিয়া, গাজীকে নিয়ে বসেছেন শাহাদাৎ চৌধুরী (শাচৌ)। উদ্দেশ্য নেক্সট অপারেশনের প্ল্যান রেডি করা। অনেকক্ষন ধইরাই শাচৌ খেয়াল করতেছিলেন বদি খালি উসখুশ করতেছে, আর আলম তারে চোখ দিয়া মানা করতেছে। শাচৌ বদিরে বিষয়টা খুইলা বলতে বললেন। বদি ঠাণ্ডা গলায় কইল, ফার্মগেটে পাইক্কাগুলার যে চেকপোস্টটা আছে, ওইটা আমি উড়ায়া দিতে চাই। হালারা বহুত বাড়ছে, এইটা একটা উচিৎ শিক্ষা হইব। শাচৌ কিচ্ছুক্ষণ তাকায়া থাকলেন বদির দিকে, যেন বদির কথা বুঝতে পারেন নাই। ফার্মগেট আর্মি চেকপোস্টটা ছোটখাট এক দুর্গের মত, অস্ত্রশস্ত্র আছে যুদ্ধ চালানোর মত, আর এই ছেলেটা বলতেছে, সেইটা অ্যাটাক করবে!! আলম তো প্রবল বেগে মাথা নাড়তে লাগলো, পাগলামির একটা লিমিট আছে। এইটা কি খেলা পাইছ? ব্যস, লেগে গেল বদির সাথে। শেষমেশ বদির চাপাচাপিতে শাচৌ রাজি হইলেন, সিদ্ধান্ত হল ফার্মগেটের আর্মি চেকপোস্ট উড়ায়ে দেওয়া হবে,সাঁড়াশি হামলা করা হবে দারুল কাবাবে। দুইটা টিম যাবে, ফার্মগেট অপারেশন শেষে গ্রেনেড ফাটায়ে সংকেত দেওয়া হবে, আরেকটা টিম তখন দারুল কাবাব হামলা করবে।
ফার্মগেট মোড়টা তখন পাঁচটা রাস্তার সরাসরি সংযোগস্থল। একদিকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, আরেকদিকে ইন্দিরা রোড, আরেকদিকে ক্যান্টনমেন্ট—সবদিক থেকেই তখন ফার্মগেট মোড়ে আসা যাইত। খামারবাড়িতে বর্তমান ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালের সামনে সেই সময় চা- মিষ্টির টং দোকান ছিল, খুব ভালো সামুসা বানাইত। তো সেই টংয়ে তারপর থেকে প্রতিদিন আলম-বদি-চুল্লুভাই-মায়া-স্বপনদের দেখা যাইতে লাগলো। মিষ্টি খাইতেছে, সামুসা খাইতেছে, ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিতেছে আত্মকেন্দ্রিক ভালো মানুষের মত। বেশ কয়েকদিন এইভাবে রেকি শেষে দেখা গেল সন্ধ্যা সাতটা থেকে সাড়ে সাতটার ডিনারের টাইমটুকু ওরা একটু রিলাক্স থাকে। তবে বাইরে তিনজন গার্ডে থাকে সবসময়। সুতরাং অ্যাটাকের জন্য এইটাই বেস্ট টাইম। আলম , জুয়েল, মায়া, পুলু আর সামাদ ভাইকে নিয়ে বদির টিম , সেই টিমের লিডার বদি। ভালো নাম বদিউল আলম। এই টিম ফার্মগেটে অপারেশন সেরে একটা ইন্ডিয়ান পাইন অ্যাপেল গ্রেনেড ফাটায়ে সংকেত দিলে বর্তমান হোটেল সোনারগাওঁয়ের পাশে দারুল কাবাবে চুল্লু ভাই আর আহমেদ জিয়া অপারেশন চালাবে। দারুল কাবাবে তখন পাকিস্তানী অফিসাররা খেতে আসে, সামনে খোলা জায়গায় জীপের বনেটে বইসা আড্ডা দেয়। টার্গেট মূলত এই আড্ডা দিতে থাকা পাইক্কাগুলা। সামাদ ভাই এয়ারফোর্সের সাবেক কর্মকর্তা, নিয়ন সাইনের মালিক। সংসারী মানুষ। তার টয়োটা সিক্সটি ফাইভ মডেলের মেটালিকা সবুজ সেডানে চেপে ৭টা ১৫ মিনিটে মগবাজারের বাসা থেকে বের হল ওরা, পরিপাটি পোশাকে আধুনিক স্টাইলের হেয়ার কাটিং দেখে ছেলেগুলোকে অভিজাত পরিবারের স্মার্ট ছেলেপেলে বলেই মনে হয়...
ফার্মগেট মোড়। আর্মি চেকপোস্ট। দুটো তাবু। তিনজন সৈন্যকে বাইরে দেখা যাচ্ছে। বাকিরা ভেতরে ডিনার করতেছে অথবা রেস্ট নিতেছে। গাড়ি চালাইতেছেন সামাদ ভাই, পাশে আলম, তার পাশে বদি। সামাদ ভাইয়ের ঠিক পিছনে স্বপন,তার পাশে পুলু আর বদির পিছনে চাপাচাপি কইরা বসছে জুয়েল আর মায়া। আসার কথা ছিল গাজীর, কিন্তু কোন কারনে গাজী আসতে পারে নাই, তাই পুলুকে নিয়ে আসা হইছিল। পুলুকে দেওয়া হইল গ্রেনেড লঞ্চ করার দায়িত্ব। ফসফরাস গ্রেনেড দিয়ে সব পুড়ায়ে দেওয়া যায়, কিন্তু দারুল কাবারের সংকেত দিতে দরকার ইন্ডিয়ান গ্রেনেডের সাউন্ড। তখনকার টয়োটাগুলায় স্টিয়ারিং হুইল স্টিয়ারিং এর সাথে, তাই সামনে তিনজন বসতে পারে। বদিদের গাড়িটা ডানদিকে ঘুরে তেজগাঁও সড়কে গিয়ে টার্ন নিয়ে আবার ধীরে ধীরে হলিক্রস কলেজের গেটের কাছে এসে থেমে গেল। গাড়ির লাইটটা অফ করে দেওয়া হইছে বহুত আগে। নিঃশব্দে নেমে গেল ছয়জন,চোখের পলকে অস্ত্র হাতে প্রস্তুত হইয়া গেল। চেকপোস্টের চারদিকে তিন ফিট উচু দেয়াল আর তার উপর তিনফিট উঁচু কাঁটাতারের বেড়া। আলম নিঃশব্দে চাইনিজ এসএমজিটা নিয়ে কাঁটাতারের বেড়ার উপর পজিশন নিল। ওর কপালটা খুব ভালো, রাইফেলের রেঞ্জে তিনটা গার্ডের দুইটারে পায়া গেল। সমস্যা হইতেছে, তিনটারে এক সাথে ফালাইতে না পারলে পরিস্থিতি কব্জা করা যাবে না। একটু পর দেখা গেল ৩য় গার্ড পকেটে হাত ঢুকায়ে মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে বাকি দুইটার আড্ডায় যোগ দিতে আসতেছে। তিনটা কাছাকাছি দেখামাত্র বদির কণ্ঠে চিৎকার শোনা গেল...
ফায়ার...
সাথে সাথে গর্জে উঠলো আলমের এসএমজি, ৩য় গার্ডটা অবাক হইয়া লক্ষ্য করল, বাকি দুইটা গার্ড কাটা কলাগাছের মত দড়াম কইরা পইড়া গেল। বিস্ময়ের প্রথম ধাক্কা সামলায়া পকেট থেইকা দুই হাত বাইর করতে করতেই তারেও নরকের ওয়ানওয়ে টিকিট ধরায়ে দিল আলমের সেকেন্ড ব্রাশফায়ার। সাথে সাথে বাকিদের একসঙ্গে ব্রাশফায়ার তাবুদুইটা লক্ষ্য কইরা। হঠাৎ আবিস্কার করল আলম, তার মাথার উপর আর দুইপাশ দিয়ে সাই সাই করে বুলেট যাইতেছে, গুলির তারস্বরে চিৎকার কিছুক্ষণের জন্য বধির করে দিল চারপাশ। আশেপাশের মানুষগুলোকে দেখে মনে হইল তারা মোমের মূর্তিতে পরিণত হইছে, ভয়ের চোটে মাটিতে ডাইভ দিতেও ভুইলা গেছে সবাই। ২০ সেকেন্ড এইভাবে টানা ফায়ার চলল, তাবুর ভেতর ও বাইরে সবকিছু ঝাঁজরা হইয়া গেল। স্বপন নির্দেশ দিল, রিট্রিট... সাথে সাথে পুলু আর জুয়েল দুইটা ইন্ডিয়ান পাইন অ্যাপেল গ্রেনেড ফালায়াই হাওয়া, সবাই কোনোমতে গাড়ির দরজায় পা রাখতে না রাখতেই টান দিল সামাদ ভাই, টয়োটা সিক্সটি ফাইভ ফার্মগেট থাইকা মুহূর্তের মধ্যে ভ্যানিশ হইয়া গেল। ইন্ডিয়ান তৎকালীন পৃথিবীর অন্যতম দুর্ধর্ষতম আর্মি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটা সুপ্রশিক্ষিত দলকে এভাবেই কয়েকটা অসমসাহসী ক্র্যাক ছেলে স্রেফ উড়ায়ে দিছিল ...জাস্ট এক মিনিটের মধ্যে...
আজাদের মগবাজারের বাসায় পরে এই অপারেশনের কথা বলতেছিল জুয়েল। চেক পোস্টের ১২ জনই মরছে এইটা শুইনা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আজাদ কইল, কয়জন মরল, সেইটার হিসাব তোরা পাইলি ক্যামনে?
হাসতে হাসতে জুয়েল কইল, পরের দিন আশরাফুলের বাড়ি গেছিলাম, ওইখানে আমাগো বন্ধু হিউবার্ট রোজারিও সব খুইলা কইল। তার বড় বোন তো হলিক্রসের টিচার, সেইদিন রাত্রে সব দেখছে। সারা রাইত আর্মি আইতে সাহস পায় নাই, পরেরদিন ভোরে আইসা ডেডবডিগুলা নিয়া গেছে। চিন্তা কর, এরা নাকি দুনিয়ার সবচেয়ে সাহসী সোলজার, লোমভর্তি শিনা চাপড়ায়া কয়, উই আর দ্যা বেস্ট। এই হইল দুনিয়ার সেরা আর্মির নমুনা। সারা রাইত সেনাগুলা পইড়া থাকলো, কেউ তো উন্ডেডও থাকতে পারে, আইসা দেখ, হসপিটালে নিয়া যা। নাহ, ইন্দুরের বাচ্চা সব, গর্ত থাইকা মুখটা বাইর করার সাহস নাই, তাও আবার ঢাকা শহরে। আরে নিউজ শুইনা নাকি ক্যান্টনমেন্টে সব সোলজারের পেশাব পাইছে, একলগে। কার আগে কে যাইব বাথরুমে, এই নিয়া হুটপাট। শ্যাষে বাথরুমে যাওয়ার আগেই নাকি কাম হয়া গেছে, প্যান্টের মধ্যেই। মুতের গন্ধে ক্যান্টনমেন্টের দিকে যাওয়া যাইতেছে না... জুয়েলের রসিকতা শুইনা হাসতে হাসতে গড়ায়া পড়ে সবাই।
আজকে প্রজন্ম কুলনেস আর তুফানি বলতে বোঝে সালমান খানরে, ৪৩ বছর আগে তৎকালীন পৃথিবীর অন্যতম সুপ্রশিক্ষিত আধুনিক পাকিস্তানী মিলিটারিরে ইন্দুরের বাচ্চা বানায়া ফালানো তারছিঁড়া কিছু ক্র্যাকরে প্রজন্ম চেনে না। চেনার চেষ্টাও নাই। প্রজন্ম খুব বিচিত্র, নিজের শেকড় নিয়া গর্ব করতে প্রজন্ম লজ্জা পায়, মায়া-আলম-বদি-জুয়েল প্রজন্মের কাছে পুরাতন ইতিহাস মাত্র। মাঝে মাঝে অবাক হইতে ভুইলা যাই। আধুনিক প্রজন্ম তো, অবাক হওয়ার কি আছে...

Courtesy: ডন মাইকেল করলেওনে

Monday, January 5, 2015

সিপাহী-জনতা বিপ্লব দিবস— আমাদের না জানা কিছু কথা

খুব ছোটবেলায় দেখতাম ৭ই নভেম্বর দিনটা আসলেই বেশ আড়ম্বরের সাথে মহা উৎসাহে ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার বিপ্লব দিবস হিসেবে দিনটা পালন হচ্ছে। ঠিক বুঝতে পারতাম না সিপাহী জনতা কিসের বিপ্লব করছিল, এর উদ্দেশ্য কি ছিল। জানতে চাইলে উদযাপনকারী বেশিরভাগ মানুষই উত্তর দিতে পারত না। আজ এতো বছর পরেও তারা উত্তর দিতে পারে না। কেবল তোতা পাখির মত মুখস্ত আউড়ে যায়, ৭ই নভেম্বর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে সিপাহি-জনতা এক ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে জেল থেকে বের করে আনে। জিয়া বহুদলীয় গনতন্ত্র প্রবর্তন করেন, দেশকে ভারতের অঙ্গরাজ্য হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করেন...
৭ই নভেম্বর, ১৯৭৫। ১০ম বেঙ্গল রেজিমেন্ট, শেরে বাঙলা নগর। অফিসারস মেসের ক্যান্টিনে পরোটা আর গরুর মাংস দিয়ে নাস্তা করছিলেন জেনারেল খালেদ মোশাররফ, লেফট্যানেন্ট কর্নেল এটিএম হায়দার ও কর্নেল নাজমুল হুদা। শ্রেণীহীন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিচিত্র লক্ষ্যে কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে রাত বারোটায় বিদ্রোহ করে পাকি এজেন্ট জিয়াকে বের করে আনে জাসদের গণবাহিনী, বিপ্লবীসেনারা ক্যান্টনমেন্টের প্রতিটি সৈনিকের মগজ ওয়াশ করে দেয় এক বিচিত্র স্লোগানে—সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই, অফিসারের রক্ত চাই। খালেদ এই ভয়ংকর সংবাদ পেয়েছেন, কিন্তু শান্ত নিঃশঙ্কচিত্ত দেখে সেটা বোঝার উপায় নেই। হঠাৎ মেজর জলিল ও মেজর আসাদ একজন বিপ্লবী হাবিলদার ও কয়েকজন সৈনিককে নিয়ে প্রবেশ করল ক্যান্টিনে। চিৎকার করে বলল,
--আমরা তোমার বিচার চাই।
পাথুরে শক্ত চোয়ালবদ্ধ খালেদের গলাটা আশ্চর্য শান্ত শোনাল, ঠিক আছে। তোমরা আমার বিচার করো। তোমাদের কমান্ডিং অফিসারের কাছে নিয়ে চলো আমাকে।
স্বয়ংক্রিয় রাইফেল বাগিয়ে হাবিলদার চিৎকার করে উঠলো,
--আমরা এখানেই তোমার বিচার করবো।
উদ্যত বন্দুকের সামনে ঠাণ্ডা চোখে ঋজু ভঙ্গিতে দাড়িয়ে থাকা মানুষটাকে হঠাৎ পাহাড়ের মত অবিচল মনে হল,
--ঠিক আছে, তোমরা এখানেই বিচার করো।
ট্যারররর... এক ঝলক আগুনের পশলায় ব্রাশফায়ার হল। মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন খালেদ মোশাররফ। সেই খালেদ মোশাররফ, যিনি একাত্তরের রনাঙ্গনে নেতা হিসেবে এক অসামান্য বীর ছিলেন, সেক্টর কমান্ডার হয়েও যুদ্ধক্ষেত্রের পেছনে বসে যুদ্ধ পরিচালনার বদলে অস্ত্র হাতে বাঘের গর্জনে ঝাঁপিয়ে পড়তেন শত্রুর উপর। সেই খালেদ মোশাররফ, যার অসমসাহসী পরিকল্পনা জেনারেল টিক্কা খানের দম্ভ করে দেওয়া ঘোষনা(জুন মাসের মধ্যে দুষ্কৃতিকারীদের দমন করে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইন চালু হবে) ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। অসংখ্যবার হামলা চালিয়ে আর শত শত সেনার মৃত্যুর পরেও আর কখনই সেই রেললাইন চালু করতে পারেনি পাকিরা। সেই খালেদ মোশাররফ , ৭১রে ২৩শে অক্টোবর যুদ্ধক্ষেত্রে মর্টার শেলের গোলা এসে লাগে যার মাথায়, অসংখ্য স্পিন্টার ঢুকে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল মাথা, কোমায় চলে যাওয়ার পরেও মেডিকেল সায়েন্সের মিরাকল ছিল তার বেঁচে ওঠা,ব্রেন অপারেশনের পরেও অনেকগুলা স্পিন্টার বের করা যায় নাই মাথা থেকে। সেই খালেদ মোশাররফ, যার ললাটে ছিল এ মাটির বীর সন্তানের জয়টিকা, মাথায় বীর উত্তমের শিরোনাস্ত্র আর মাথার বামপাশে আজীবন পাকি গোলন্দাজ বাহিনীর কামানের গোলা। সেই খালেদ মোশাররফ লুটিয়ে পড়লেন। স্বাধীনতার আদর্শ আর চেতনার অনির্বাণ শিখা জ্বালিয়ে রাখার অপরাধে তার বিচার সম্পন্ন হল...
দুই নম্বর সেক্টরের ক্র্যাক প্লাটুনের কারিগর, গেরিলাযুদ্ধের সংজ্ঞা পরিবর্তন করে দেওয়া অবিস্মরণীয় বীর এটিএম হায়দারকে টেনে হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে এল উন্মত্ত বিপ্লবীরা। পৈশাচিক কায়দায় বেয়নেট চার্জ করতে করতে হঠাৎ এক পশলা ব্রাশফায়ার করল কেউ। একাত্তরের ভারতীয় জেনারেল অরোরা আর পাকি জেনারেল নিয়াজির সাথে যে অকুতোভয় বঙ্গশার্দূল দৃঢ় পায়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন আত্মসমর্পণস্থলে, তাকে বিনা কারনে নির্মমভাবে মেরে ফেলা হল।
১৯৭১ সালে পাকিস্তান সভ্যতার নিকৃষ্টতম গণহত্যা চালিয়েও আমাদের দমাতে পারেনি, ওদের হাঁটুমুড়ে, নাকেখত দিতে বাধ্য করেছিলাম আমরা, ছিনিয়ে এনেছিলাম বিজয়ের লাল সূর্যটা। ক্ষমা চাওয়ার বদলে এই দেশকে আবার পাকিস্তান বানাবার অব্যাহত চক্রান্তের শুরু সেই তখন থেকেই। পাকিস্তানের সেই চক্রান্ত অনেকাংশে সফল হয়ে যায়, যখন পাকি স্লিপিং এজেন্ট জিয়ার পরোক্ষ সাহায্য ও সহযোগিতায় শেখ মুজিব , তার পরিবার ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে ফারুক-ডালিম গং। খালেদ জিয়াকে চিনতে পেরেছিলেন,তাই ৩রা নভেম্বর বিশ্বাসঘাতক জিয়াকে বন্দী করেছিলেন, বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সব চক্রান্তের বিরুদ্ধে। ঠিক এই সংকটকালে কর্নেল তাহের সমাজতন্ত্রের অলীক স্বপ্ন বাস্তবায়নে বিচিত্র এক বিপ্লব ঘটালেন, জিয়া মুক্ত হয়েই শাসনক্ষমতা অখল করল,খালেদ-হায়দার-হুদাদের ব্রাশফায়ার করে নির্মমভাবে মেরে ফেলা হল। একজন পাকিস্তানীকে বিশ্বাস করার মাশুল তাহের দিলেন ফাঁসিতে ঝুলে। অন্ধকার সময়ে হারিয়ে গেল মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা... বাংলাদেশ...
চিন্তা করো না, আমি ভালো আছি। কাল সকালেই আসব...
স্ত্রী সালমা খালেদকে দেওয়া কথা রাখতে পারেননি খালেদ। ফিরতে পারেননি আর তিনি, ফিরতে পারেননি এটিএম হায়দার , কর্নেল হুদার মত বাঙলা মায়ের হাজারো বীর সন্তান। যে বাংলাদেশের জন্য তারা সংগ্রাম করেছিলেন, সে বাংলাদেশকেও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। নিষ্ঠার সাথে অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছিল জিয়া, স্বাধীন বাংলাদেশের ধমনীতে সযত্নে ঢুকিয়ে দিয়েছিল দূষিত পাকিস্তানী রক্ত। তাই আজো লাল-সবুজের পতাকার খামচে ধরে চাঁদতারা রঙের শকুন, লাল টকটকে সূর্যের এক রোদঝলমলে সকালে রাজপথের মিছিলে বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালন করে কিছু শুয়োর...

Courtesy: ডন মাইকেল করলেওনে